কুমিল্লার চান্দিনায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একমাত্র খেলার মাঠের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে পাকা সড়ক। দীর্ঘদিন ধরে মাঠের বুক চিরে যানবাহন চলাচল করায় দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ। এবার সেই সড়কটি ১৮ ফুট প্রশস্ত করার উদ্যোগ নেওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এতে বিদ্যালয়ের ২৫২ শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা যেমন ঝুঁকির মুখে পড়বে, তেমনি সংকুচিত হয়ে পড়বে শিশুদের একমাত্র খেলার মাঠ।
চান্দিনা উপজেলার মাইজখার ইউনিয়নের কামারখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের মাঠের মাঝ দিয়েই চলে গেছে প্রায় ৭৫ ফুট দীর্ঘ এবং ১০ থেকে ১২ ফুট প্রশস্ত একটি পাকা সড়ক। প্রতিদিন এ সড়ক দিয়ে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল করে। ফলে শ্রেণিকক্ষ থেকে বের হয়ে মাঠে খেলতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে উদ্বিগ্ন শিক্ষক ও অভিভাবকরা।
শুধু বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার জন্য নয়, মাঠটি স্থানীয় সামাজিক ও ধর্মীয় বিভিন্ন আয়োজনেও ব্যবহৃত হয়। বিদ্যালয়ের পাশে রয়েছে ফোরকানিয়া মাদ্রাসা, জামে মসজিদ ও খানকা। সামাজিক সভা, মাহফিল, ঈদগাহ ও জানাজার মতো আয়োজনেও মাঠটি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু মাঠের মাঝ দিয়ে সড়ক চলে যাওয়ায় পুরো মাঠ একসঙ্গে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, সরকারি নকশা অনুযায়ী বিদ্যালয়ের মাঠের বাইরে রাস্তার জায়গা রয়েছে। কিন্তু প্রায় দুই যুগ আগে একটি বিকল্প পথ হিসেবে বিদ্যালয়ের জমির ওপর দিয়ে চলাচল শুরু হয়। পরবর্তীতে সেই বিকল্প পথই পাকা সড়কে পরিণত হয়ে স্থায়ী রূপ নেয়।
এখন ওই সড়কটি আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) পক্ষ থেকে সড়ক সম্প্রসারণের জন্য সার্ভে চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সড়কটি ১৮ ফুট প্রশস্ত করা হতে পারে। এতে মাঠের ওপর চাপ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
সড়কটি সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন করেছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাধব চন্দ্র বণিক ১০ এপ্রিল ২০২৫ চান্দিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন করেন। আবেদনটি ৭১৩ নম্বর স্মারকে লিপিবদ্ধ হয়। একই বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ও জেলা প্রশাসক বরাবরও আবেদন করা হয়েছে।
পরে ২৭ এপ্রিল ২০২৫ বিদ্যালয়ের জমি ও সরকারি নকশা অনুযায়ী রাস্তার অবস্থান নির্ধারণে সার্ভেয়ারের মাধ্যমে পরিমাপের জন্য উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর আবেদন করা হয়। বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২৯ জুলাই ২০২৫ উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার সায়েলা শারমিন ও চেইনম্যান নাজমুল হক সরেজমিনে বিদ্যালয়ের জমি ও রাস্তা পরিমাপ করেন। তবে এরপরও রাস্তা সরানোর বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
এদিকে ১২ জুন ২০২৫ দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক নুরুল ইসলাম ও স্থানীয় ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে বিদ্যালয়ের মাঠ থেকে রাস্তা সরিয়ে সরকারি নকশা অনুযায়ী রাস্তা নেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্য হয়। পরে সিদ্ধান্তটি লিখিতভাবে উপস্থাপন করে উপস্থিত ব্যক্তিরা গণস্বাক্ষর দিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জমা দেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মোতালেবের দাবি, সরকারি নকশা অনুযায়ী বিদ্যালয়ের উত্তর পাশ দিয়ে রাস্তা যাওয়ার কথা ছিল। সাম্পুরা বাড়ির কবরস্থানের পশ্চিম-উত্তর কোণ থেকে বর্তমান কামারখোলা ঈদগাহ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ফটক বরাবর ওই রাস্তার অবস্থান ছিল।
তিনি জানান, সাম্পুরা বাড়ির পুকুরের উত্তর পাড়সংলগ্ন পুরোনো রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়লে পথচারী ও যানবাহনের সুবিধার্থে বিদ্যালয়ের জমির ওপর দিয়ে বিকল্পভাবে চলাচল শুরু হয়। পরে সেই বিকল্প পথ আর সরানো হয়নি।
্
কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাইফুল ইসলাম বলেন, “জেলা প্রশাসক বরাবর অভিযোগ দিয়ে থাকলে ইউএনওকে বলা হবে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য। ইউএনও সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।”
চান্দিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল হক বলেন, “বিদ্যালয়ের মাঠের মাঝখান দিয়ে রাস্তা চলে যাওয়ায় কিছুটা অসুবিধা হচ্ছে। স্কুল কর্তৃপক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে এলজিইডিকে রাস্তা সরানোর ব্যাপারে অবহিত করেছি।”
চান্দিনা উপজেলা প্রকৌশলী গোলাম উল্লাহ বলেন, “তাদের কাছ থেকে অভিযোগ পেয়েছি। আমরা সড়ক সম্প্রসারণের কাজের জন্য সার্ভে করছি। ১৮ ফুট প্রস্থ হবে। মাঠের মাঝে ১৮ ফুট সড়ক গেলে ভোগান্তি আরও বাড়বে। আমরা তাদের সঙ্গে আলোচনা করে রাস্তাটি কীভাবে দক্ষিণ পাশের ভবন ভেঙে নেওয়া যায়, সেটি দেখছি।”
সড়কের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের ৩৯ শতাংশ জমির মালিকানা ও নামজারি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিদ্যালয় সূত্রের দাবি, দলিল থাকলেও ৩৯ শতাংশ জমির পুরোটা বিদ্যালয়ের নামে নামজারি হয়নি। এর মধ্যে ১৬ শতাংশ জমি নামজারি করার সুযোগ থাকলেও তা করা হয়নি।
অন্যদিকে বাকি ২৩ শতাংশ জমি আলী আকবর ও আ. মতিন গংয়ের নামে রয়েছে বলে বিদ্যালয় সূত্রে দাবি করা হলেও প্রকৃতপক্ষে তাদের নামে ওই পরিমাণ সম্পত্তি নেই। তাদের নামে সম্পত্তির পরিমাণ ৩ শতাংশ বলে দাবি বিদ্যালয় সূত্রের।
বিদ্যালয় রেজিস্ট্রেশনের সময় জমির পরিমাণ দেখাতে অনিয়ম বা প্রতারণা হয়েছিল বলেও স্থানীয়দের একাংশ অভিযোগ করেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও রেকর্ড যাচাই করে প্রকৃত অবস্থা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
এ ছাড়া বিদ্যালয়ের শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলমের পরিবার বিদ্যালয়ের নামে জমি দান করলেও ওই সম্পত্তির প্রায় ০.৩০ শতাংশ জাহাঙ্গীর আলম ও তাঁর দুই ভাইয়ের নামে লিপিবদ্ধ রয়েছে বলে বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগের বিষয়ে শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “ভুলবশত দান করা জমির কিয়দংশ আমাদের নামে হয়েছে। আমি দাখিলা কেটেছি। স্কুলের জমি স্কুলকে ফিরিয়ে দেব।”
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাধব চন্দ্র বণিক বলেন, “সরকারি নকশা, ভূমির রেকর্ড ও সরেজমিন বাস্তবতা যাচাই করে এমন একটি সমাধান করা হোক, যাতে জনসাধারণের চলাচলের রাস্তা থাকে; কিন্তু ২৫২ শিশুর একমাত্র খেলার মাঠটি সড়কের চাপে আরও সংকুচিত না হয়। রাস্তা প্রয়োজন, কিন্তু শিশুদের নিরাপদ মাঠও প্রয়োজন। বিদ্যালয়ের নতুন কমিটি গঠন হলে জমি-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানের চেষ্টা হবে।”
স্থানীয়দের দাবি, সরকারি নকশা, ভূমির রেকর্ড ও বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করে দ্রুত বিকল্প রাস্তার ব্যবস্থা করা হোক। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের একমাত্র খেলার মাঠটি শিশুদের জন্য নিরাপদ ও উন্মুক্ত রাখা হোক।
মোঃ মাসুদ রানা