টিউশনের আয় কিংবা বাড়ি থেকে পাওয়া অর্থের বড় একটি অংশ চলে যায় মেসভাড়া, খাবার ও যাতায়াতের পেছনে। ক্যাম্পাসের বাইরে থাকলে নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা, আর হলে উঠতে পারলেও মিলছে না স্বস্তির আবাসন। চারজনের জন্য নির্ধারিত কক্ষে থাকতে হচ্ছে ৮ থেকে ১০ জনকে। কারও ঠাঁই হচ্ছে মেঝেতে, কারও ভাগে জুটছে না পড়ার টেবিলটুকুও।
এ চিত্র কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আবাসনসংকটের। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ২০ বছর পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ শিক্ষার্থীর জন্য আবাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়নি। ফলে আবাসনসংকটের চাপ সামলাতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বাড়তি অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে পড়াশোনা, ঘুম ও স্বাভাবিক জীবনযাপন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬ হাজার ৪৮৪ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তবে এর বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি আবাসিক হলে আসন রয়েছে ১ হাজার ৪৪৪টি। অর্থাৎ, বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ২২.২৭ শতাংশের জন্য আবাসিক আসন রয়েছে।
রেজিস্ট্রার দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি আবাসিক হলে নির্ধারিত আসনের বিপরীতে হলে থাকছেন ১ হাজার ৬৪৫ জন শিক্ষার্থী। অর্থাৎ, আসনের তুলনায় অতিরিক্ত ২০১ জন শিক্ষার্থী হলে অবস্থান করছেন। হলভিত্তিক হিসাবেও ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর উপস্থিতি দেখা গেছে।
তথ্য অনুযায়ী, বিজয়-২৪ হলে ৪২০ আসনের বিপরীতে থাকছেন ৫২০ জন শিক্ষার্থী। কাজী নজরুল ইসলাম হলে ১৮০ আসনের বিপরীতে ২১০ জন, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলে ১৪৬ আসনের বিপরীতে ১৭০ জন, নওয়াব ফয়েজুন্নেসা চৌধুরানী হলে ১৯৭ আসনের বিপরীতে ২৯৬ জন এবং সুনীতি শান্তি হলে ২৫৬ আসনের বিপরীতে ৩৬৬ জন শিক্ষার্থী থাকছেন।
আসনের তুলনায় শিক্ষার্থী বেশি হওয়ায় আবাসিক হলগুলোতে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে অনেককে। কোথাও একই বিছানা ভাগাভাগি করে থাকতে হচ্ছে, কোথাও মেঝেতে বিছানা পেতে রাত কাটাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। চারজনের থাকার উপযোগী কক্ষে আটজন থেকে বারো জনকে থাকতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। এতে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত পরিসর ও স্বাভাবিক পড়াশোনার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।
অন্যদিকে, ৪ হাজার ৮৩৯ শিক্ষার্থীকে হলের বাইরে বাড়ি থেকে এসে কিংবা মেসে থেকে পড়াশোনা করতে হচ্ছে। অর্থাৎ মোট শিক্ষার্থীর ৭৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ শিক্ষার্থী হলের বাইরে থাকছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস দূরে হওয়ায় বাড়িতে আসা ও আশপাশের বিভিন্ন মেসে থাকতে হওয়ায় শিক্ষার্থীদের আবাসন ব্যয়ের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় থাকতে হচ্ছে। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর এ উদ্বেগ আরও বেড়েছে। এ ছাড়া কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা এবং বিভিন্ন সময়ে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনার কারণে ক্যাম্পাসের বাইরে বসবাসকারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী রাহাত আকন্দ মনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থাকার কারণে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। একটু রাত হলে, ৭টা বা ৮টা বাজলেও নিরাপত্তা নিয়ে ভয় লাগে। বিভিন্ন জায়গায় ছিনতাই ও হত্যার ঘটনা ঘটছে। কয়েক দিন আগে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ম্যামের ছেলেকে ক্যাম্পাসের পাশেই হত্যা করা হয়েছে। এ কারণে আমরা খুবই আশঙ্কার মধ্যে থাকি।’
শুধু নতুন শিক্ষার্থীরাই নন, দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন—এমন শিক্ষার্থীদেরও আবাসিক হলে আসন পেতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফাইরোজ মাহি বলেন, ‘দেড় বছর হয়ে গেছে, এখনো হলে কোনো সিট পাইনি। আমাদের যে হলগুলো রয়েছে, সেগুলোতে সিট পাওয়া প্রায় অসম্ভব। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসনসংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের ভর্তুকি দেওয়া হয়। আমাদেরও যদি এ ধরনের ভর্তুকির ব্যবস্থা থাকত, তাহলে ভালো হতো।’
উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. এম এম শরীফুল করীম বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়টি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় নয়। ফলে এখানে সবার আবাসন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।’
তিনি আরো বলেন, তবে দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের হলগুলো চালু হলে আবাসনসংকট থাকবে না বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন উপাচার্য। তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয় ক্যাম্পাসে আমাদের চারটি হল রয়েছে। প্রতিটি হলেই প্রায় এক হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। হলগুলো চালু হলে আমাদের আবাসনসংকট তো থাকবে না; বরং অতিরিক্ত রুম ফাঁকা পড়ে থাকবে।’
মোঃবিল্লাল হোসেন, কুবি প্রতিনিধি