“প্রতিরোধ দিবসের বিজয় এসেছিল কেন এই প্রশ্নের উত্তর একটাই, তা হলো ইস্পাত-কঠিন ঐক্য। আর সেই জুলাই কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর নয়; জুলাই বাংলাদেশের সকল মানুষের।” কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) ‘১১ জুলাই প্রতিরোধ দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এভাবেই বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ পাবলিক কমিশনের সদস্য ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস।
রোববার (১২ জুলাই) বিকেল ৩টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে ‘প্রতিরোধ দিবস’ উপলক্ষে আলোচনা সভায় তিনি এই কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করীম। মুখ্য আলোচক হিসেবে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাসুদা কামাল এবং ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোলায়মান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ‘প্রতিরোধ দিবস’ উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকার।
প্রধান আলোচকের বক্তব্যে সায়মা বলেন, আন্দোলনের সময় নারীরা পুরুষদের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, আবার ছাত্রীদের নিরাপত্তায় ছাত্ররা অটল প্রাচীরের মতো অবস্থান নিয়েছিল। এই পারস্পরিক আস্থা, সম্প্রীতি ও ঐক্যই ছিল আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
তিনি বলেন, “সেই ঐক্যের কারণেই পরবর্তী ৩৬ দিনের রক্তাক্ত, যন্ত্রণাময় সময়েও রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট বাহিনী ও ক্ষমতার কাঠামো পরাজিত হয়েছিল।”
ড. সায়মা বলেন, আন্দোলনের রাজপথে কোনো একক দল, ধর্ম, শ্রেণি বা লিঙ্গের মানুষ ছিল না। সেখানে নারী-পুরুষ, ছাত্র-জনতা, শ্রমজীবী, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, এমনকি দেশের বাইরের প্রবাসীরাও এক হয়ে একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। বিভাজনের সব দেয়াল সেদিন ভেঙে পড়েছিল।
তিনি বলেন, “এই জুলাই কারও একার না। কোনো এক দলের না, কোনো এক শ্রেণি-পেশারও না। এই জুলাই আমাদের সবার।”
বক্তব্যে তিনি আন্দোলনে নিহতদের পরিবারের আত্মত্যাগের কথাও স্মরণ করেন। তিনি বলেন, যেসব মা সন্তান হারিয়েও সংগ্রামের আহ্বান জানিয়েছেন, যেসব বাবা হাসপাতালের করিডোরে সন্তানের মরদেহ নিয়ে নির্বাক হয়ে বসেছিলেন এবং যেসব প্রবাসী অত্যাচারের প্রতিবাদে দেশে অর্থ পাঠানো বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছিলেন-জুলাই তাদেরও।
জুলাই-পরবর্তী সময়ে বিভাজনের রাজনীতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মতো জুলাইয়ের চেতনাকেও কেউ যেন রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে। তাঁর ভাষায়, “জুলাই নিয়ে কেউ ব্যবসা করতে পারবে না। জুলাইকে কেউ একার করে দাবি করতে পারবে না। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একটি গোষ্ঠী ছাড়া দেশের সব মানুষের জুলাই এটি।”
তিনি আরও বলেন, গত ১৬ বছরে ভিন্নমত প্রকাশের কারণে বহু মানুষ, বিশেষ করে ছাত্র-ছাত্রী ও রাজনৈতিক কর্মীদের নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। তাই জুলাই কেবল একটি আন্দোলনের স্মৃতি নয়, বরং নিপীড়নের বিরুদ্ধে মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধের প্রতীক।
একজন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ড. সায়মা বলেন, “আগেও যেমন ভাবতাম, এখনও বলি- আমার ছাত্র-ছাত্রীরা আমার সন্তান।”
তিনি বলেন, দুই বছর পেরিয়ে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো “কী পেলাম বা কী পেলাম না” নয়; বরং সামনে আমাদের দায়িত্ব কী।
জুলাই আন্দোলনের সাফল্য নিয়ে বিতর্কের সমালোচনা করে তিনি বলেন, পতিত শাসনের সমর্থকেরা ছোট-বড় ভুলকে হাতিয়ার করে আন্দোলনের অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে। কিন্তু আন্দোলনের প্রথম লক্ষ্য ছিল রক্তাক্ত দমন-পীড়ন বন্ধ করা এবং দ্বিতীয় লক্ষ্য ছিল একনায়কতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদ থেকে দেশকে মুক্ত করা। সেই লক্ষ্য অর্জনে মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধই ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি।
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ঐক্য অটুট রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ইতিহাসের এই শিক্ষা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গঠনের পথ দেখাবে, আর ঐক্যই হবে যেকোনো অন্যায় ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর শক্তি।
কুবি প্রতিনিধি