কুমিল্লা | বঙ্গাব্দ

শুভ্রর বি'রুদ্ধে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে অপ'রাধচক্রের তৎপরতার অভিযোগ

  • প্রকাশের তারিখ : 19-জুন-2026 ইং
ছবির ক্যাপশন:

কুমিল্লা নগরীতে সাংবাদিক ও পেশাজীবী মওদুদ আব্দুল্লাহ শুভ্র দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের হামলা, হুমকি ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একাধিক মামলা, সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপি দেওয়ার পরও তিনি ও তাঁর পরিবার এখনও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে দাবি করেছেন।

ভুক্তভোগীর অভিযোগ, গত প্রায় এক যুগ ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র তাঁকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে। এর মধ্যে হামলা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার, মানসিক হয়রানি এবং প্রাণনাশের হুমকির মতো অভিযোগ রয়েছে।

শুভ্র জানান, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে কাজ করার কারণে একটি স্বার্থান্বেষী মহল দীর্ঘদিন ধরে তাঁর বিরুদ্ধে সক্রিয়। সময়ের সঙ্গে তাদের কর্মকাণ্ড আরও সংগঠিত ও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে তিনি দাবি করেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ৩ মে থেকে ২০২৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে তিনি নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একাধিক জিডি করেছেন। এসব অভিযোগে পেশাগত কাজে বাধা, চাঁদা দাবি, অনুসরণ, প্রকাশ্যে হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, প্রাণনাশের হুমকি এবং ছিনতাইয়ের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।

তিনি দাবি করেন, বিভিন্ন সময়ে মোটরসাইকেলে আসা হেলমেটধারী দুর্বৃত্তরা তাঁর গতিরোধ করে হামলা চালিয়েছে। কয়েকটি ঘটনায় ক্যামেরা, মোবাইল ফোন, গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসংবলিত ডিভাইস এবং নগদ অর্থ ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগও করেছেন তিনি।

শুভ্রর ভাষ্য, এসব ঘটনার উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে পেশাগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে নীরব করে রাখা। তবে তিনি ধারাবাহিকভাবে আইনি প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রেখে আদালত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা চেয়ে আসছেন।

আদালতে মামলা

গত ১৬ অক্টোবর ২০২৫ তিনি কুমিল্লা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালত-১ এ একটি সিআর মামলা দায়ের করেন। মামলায় তিনজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও পাঁচ থেকে ছয়জনকে আসামি করা হয়। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্তের জন্য কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানাকে নির্দেশ দেন।

দণ্ডবিধির ১৪৩, ৩২৩, ৩০৭, ৩৮৫, ৪২০, ৫০০, ৫১১, ৩৭৯ এবং ৫০৬(২)/৩৪ ধারায় দায়ের করা মামলাটির নম্বর ৬১৫/২৫। এতে সংঘবদ্ধ হামলা, চাঁদাবাজির চেষ্টা, প্রতারণা, ছিনতাই ও হত্যাচেষ্টাসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছে।

চক্রটি এখনও সক্রিয়’

ভুক্তভোগীর দাবি, অভিযুক্তরা সাধারণত মুখে মাস্ক ও মাথায় লাল-কালো রঙের হেলমেট ব্যবহার করে এবং অনেক সময় নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেলে চলাচল করে। এতে তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, চক্রটি বিভিন্ন বয়সী ভাড়াটে বখাটে, ছিনতাইকারী ও নারী সদস্যদের ব্যবহার করে সামাজিক হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, মব সৃষ্টি এবং হামলার মতো কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে।

শুভ্রর দাবি, অতীতে র‌্যাব, ডিবি ও থানা পুলিশের অভিযানে চক্রটির কয়েকজন সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছিল এবং বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছিল। এ-সংক্রান্ত সংবাদ স্থানীয় গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছিল বলে তিনি জানান।

তদন্তাধীন আরও দুটি মামলা

ভুক্তভোগীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তাঁর দায়ের করা আরও দুটি মামলা কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় তদন্তাধীন রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলার এফআইআর নম্বর ৪১ (জিআর-৮৫০, ১৪ নভেম্বর ২০২৪) এবং অন্যটি দস্যুতা সংক্রান্ত, যার এফআইআর নম্বর ৫১ (জিআর-৮১২, ১৬ অক্টোবর ২০২৫)।

তিনি অভিযোগ করেন, মামলার দুই আসামি গ্রেপ্তার হলেও চক্রটির মূল সদস্য ও অন্যান্য সহযোগীরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। পাশাপাশি মামলা প্রত্যাহারের জন্য বিভিন্নভাবে চাপ ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাঁর।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারের অভিযোগ

শুভ্রর অভিযোগ, অনিবন্ধিত ফেসবুক পেজ, ভুয়া আইডি ও মেসেঞ্জার অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। বিকৃত ও আপত্তিকর ছবি প্রচার এবং মৃত্যুর ইঙ্গিতবাহী প্রতীকী ছবি ছড়িয়ে ভয়ভীতি সৃষ্টিরও অভিযোগ করেছেন তিনি।

প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন

নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে গত ১৩ মার্চ ২০২৬ তিনি কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি অনলাইন জিডি করেন। জিডি নম্বর ৯৫৩।

এ ছাড়া গত ১০ মে কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেন, যার রিসিভড ডকেট নম্বর ৭৫৮১। পরে ২৬ মে পুলিশ সুপারের কাছেও পৃথক স্মারকলিপি জমা দেন। এসব আবেদনে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানান তিনি।

মানবাধিকারকর্মীর উদ্বেগ

মানবাধিকার কর্মী ও মানবাধিকার খবর-এর সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন বলেন, “একজন সাংবাদিক যদি বারবার আইনের আশ্রয় নেওয়ার পরও দীর্ঘদিন নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তাহলে বিষয়টি উদ্বেগজনক। অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।”

কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, ভুক্তভোগীর দায়ের করা মামলা ও জিডিগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

তিনি বলেন, “অভিযুক্তরা ঘন ঘন অবস্থান পরিবর্তন করায় তাদের গ্রেপ্তারে কিছুটা সময় লাগছে। তবে তদন্ত চলমান রয়েছে এবং বাকি আসামিদের আইনের আওতায় আনতে কাজ করা হচ্ছে।”

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং ভুক্তভোগী সাংবাদিক ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের প্রতি জনআস্থা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

কমেন্ট বক্স
প্রতিবেদকের তথ্য
ডেস্ক নিউজ

ডেস্ক নিউজ