কুমিল্লার শিক্ষা অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে সাফল্যের ঝলমলে ইমেজ ধরে রাখা একটি বেসরকারি কলেজকে ঘিরে উঠেছে গুরুতর অনিয়ম, প্রতারণা ও অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ। নগরীর আলোচিত রূপসী বাংলা কলেজ এবং একই মালিকানাধীন আরও কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বোর্ড পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন জালিয়াতি, শিক্ষার্থী স্থানান্তর বাণিজ্য, ভর্তি সিন্ডিকেট এবং ট্রান্সফার সার্টিফিকেট (টিসি) বাণিজ্যের মতো গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
অভিযোগ রয়েছে, কলেজটির ঝকঝকে ফলাফল ও সাফল্যের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে একটি সুসংগঠিত কৌশলের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন পরিবর্তন, অন্য প্রতিষ্ঠানের নামে ভর্তি দেখানো এবং টিসি প্রদানকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বোর্ড পরীক্ষার ফলাফলে নিজেদের অবস্থান উজ্জ্বল দেখাতে কলেজ কর্তৃপক্ষ বিশেষ একটি কৌশল অনুসরণ করছে ।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে মেধাবী শিক্ষার্থীদের বাছাই করে তাদের রূপসী বাংলা কলেজের নামে রেজিস্ট্রেশন করানো হয়। ফলে বোর্ড পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের সময় কাগজে-কলমে কলেজটির পাসের হার ও জিপিএ–৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেশি দেখা যায়।
অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত দুর্বল বা সাধারণ মানের শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন করা হয় মালিকপক্ষের পরিচালিত অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ অন্যতম বলে অভিযোগ উঠেছে।
ফলে বাস্তবে শিক্ষার্থীরা এক প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করলেও বোর্ডের নথিতে তাদের নাম থাকে অন্য প্রতিষ্ঠানের অধীনে। এতে রূপসী বাংলা কলেজের ফলাফল কৃত্রিমভাবে দেখানো হয় উজ্জ্বল।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য বড় ধরনের হুমকি। একই মালিকানায় একাধিক প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, রূপসী বাংলা কলেজের মালিকপক্ষ একই সঙ্গে আরও কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক কম পরিচিত বা শিক্ষার্থীদের কাছে কম আকর্ষণীয়।
অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানকে একটি নেটওয়ার্ক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। মেধাবী শিক্ষার্থীদের মূল কলেজে রেজিস্ট্রেশন করিয়ে ভালো ফলাফল নিশ্চিত করা হয়, আর অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীদের অন্য প্রতিষ্ঠানের নামে দেখানো হয়। ফলে কাগজে-কলমে রূপসী বাংলা কলেজের ফলাফল অত্যন্ত উজ্জ্বল দেখালেও বাস্তবে তা একটি পরিকল্পিত জালিয়াতির ফল বলে অভিযোগ করছেন অনেকেই।
ভুক্তভোগী অভিভাবকদের অভিযোগ, অনেক শিক্ষার্থী রূপসী বাংলা কলেজে ভর্তি হওয়ার উদ্দেশ্যে গেলেও বিভিন্ন অজুহাতে তাদের সেখানে ভর্তি না দেখিয়ে মালিকপক্ষের অন্য প্রতিষ্ঠানে ভর্তি দেখানো হয়।
অভিযোগ রয়েছে, কলেজটির সিট খালি রেখে পরবর্তীতে মোটা অংকের ডোনেশন বা বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি করানোর জন্য এই কৌশল ব্যবহার করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অভিভাবক বলেন, “আমরা রূপসী বাংলা কলেজে ভর্তি করানোর জন্য আবেদন করি। পরে জানতে পারি আমাদের সন্তানের ভর্তি অন্য কলেজে দেখানো হয়েছে, অথচ সে প্রতিদিন রূপসী বাংলা কলেজেই ক্লাস করছে।”
এ ধরনের অভিযোগে অনেক অভিভাবক নিজেদের প্রতারিত মনে করছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, তিনি রূপসী বাংলা কলেজে নিয়ম অনুযায়ী ভর্তি হন এবং সেখানেই নিয়মিত ক্লাস করেন। কিন্তু পরবর্তীতে বোর্ড পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হওয়ার পর যখন পরীক্ষার এডমিট কার্ড হাতে পান, তখন সেখানে দেখতে পান তার রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নামে।
শিক্ষার্থীর ভাষ্য, “আমি রূপসী বাংলা কলেজে ভর্তি হয়েছি এবং সেখানেই পড়াশোনা করছি। কিন্তু পরীক্ষার এডমিট কার্ডে দেখি আমার রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নামে। বিষয়টি জানার পর আমি খুবই অবাক হয়েছি।”
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি কলেজ কর্তৃপক্ষকে জানালেও সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা পাননি।
অভিযোগ রয়েছে, অনেক শিক্ষার্থী অন্য কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য টিসি নিতে গেলে নানা ধরনের জটিলতার মুখে পড়ছেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা দাবি করেছেন, টিসি নিতে গেলে তাদের কাছ থেকে পুরো এক বছরের অগ্রিম বেতন পরিশোধ করতে বলা হয়। অন্যথায় টিসি দেওয়া হয় না। কিন্তু সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কোনো শিক্ষার্থী প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করতে চাইলে নির্ধারিত বকেয়া পরিশোধ সাপেক্ষে টিসি পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এক বছরের অগ্রিম বেতন নেওয়ার কোনো বিধান নেই।
অভিভাবকদের মতে, এটি শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে অর্থ আদায়ের একটি কৌশল। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সমস্যার সমাধানের জন্য তারা শিক্ষা বোর্ডে যোগাযোগ করলেও কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা পাননি। কিছু শিক্ষার্থীর দাবি, বোর্ডে অভিযোগ জানালে অনেক ক্ষেত্রে কলেজ কর্তৃপক্ষের পক্ষেই অবস্থান নেওয়া হয়েছে। এ কারণে বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা বোর্ডের তদারকি ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রূপসী বাংলা কলেজের প্রিন্সিপাল ইয়াসিনুর রহমান। তিনি বলেন, “আমাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ভর্তি বা রেজিস্ট্রেশন নিয়ে কোনো ধরনের জালিয়াতি এখানে হয় না। কোনো শিক্ষার্থীর কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার বিষয়টিও সত্য নয়।”
টিসি নিতে এক বছরের অর্থ নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “যে অর্থ নেওয়া হয়েছে বলে বলা হচ্ছে সেটি মূলত শিক্ষার্থীর পূর্বের বকেয়া ফি।”
শিক্ষাবিদ ও সচেতন অভিভাবকদের মতে, শিক্ষা কোনোভাবেই ব্যবসার পণ্য হতে পারে না। মেধাবী শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানের সুনাম বাড়ানো এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অনৈতিকভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক। তারা দ্রুত বিষয়টি তদন্ত করার দাবি জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দাবি, কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় যেন অবিলম্বে রূপসী বাংলা কলেজের রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া, ভর্তি কার্যক্রম এবং আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
তাদের মতে, দ্রুত তদন্ত না হলে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা আরও কমে যাবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক