কুমিল্লা | বঙ্গাব্দ

নীরবতা ভেঙে এগিয়ে যাওয়া: মাসিক, মনোভাব এবং মর্যাদার জন্য এক সামাজিক আন্দোলন

  • প্রকাশের তারিখ : 7-আগস্ট-2025 ইং
ছবির ক্যাপশন:

মো ইয়াসির রহমান ভুইয়া।।
এই দেশে এখনো একটি প্রাকৃতিক বিষয়কে ঘিরে রয়েছে সামাজিক গ্লানি, অনুচ্চারিত ব্যথা আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহন করে চলা লজ্জা। বিষয়টি এমন নয় যে তা কোনো অপরাধ, বরং এটি জীবনের পূর্বশর্ত-মাসিক। এই রক্তের ইতিহাস কোনো কাহিনি নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের শিকড়। কিন্তু আফসোস, এই সমাজ সেই শিকড়কে অস্বীকার করে। মেয়েরা মাসিক হলে শিখে চুপ থাকতে হবে। বলা যাবে না, প্রকাশ করা যাবে না, বুঝতে পারা যাবে না।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকেঃ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, স্বাস্থ্যসম্মতভাবে মাসিক পরিচর্যার অভাব মেয়েদের জীবনে ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন, ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (UTI), প্রজনন সমস্যা এমনকি বিভিন্ন স্তরের মানসিক চাপ ও অবসাদ তৈরি করতে পারে। অপরিষ্কার কাপড় ব্যবহার বা অপর্যাপ্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কারণে জরায়ুর সংক্রমণ (Pelvic Inflammatory Disease) পর্যন্ত হতে পারে, যা ভবিষ্যতে বন্ধ্যাত্বের কারণও হতে পারে। শুধু শারীরিক নয়, মানসিক প্রভাবও মারাত্মক। বারবার লজ্জা, গোপনীয়তা আর অপমান মেয়েদের আত্মসম্মানে স্থায়ী ক্ষত তৈরি করে। ডিপ্রেশন ও আত্মবিশ্বাস হারানো এর এক অনিবার্য ফলাফল।

বাংলাদেশের বাস্তবতাঃ
বাংলাদেশে ৭০% এর বেশি কিশোরী এখনো মাসিক নিয়ে কোনো পেশাদার স্বাস্থ্য শিক্ষা পায় না। অধিকাংশ নির্ভর করে 'আপু বলেছে', 'আম্মু বলেছে', কিংবা 'বড় বোনের কাছ থেকে জেনেছি' এমন অনানুষ্ঠানিক, ভুলে ভরা উৎসের উপর।

সরকারি স্কুলগুলোর ৮০% এর বেশি স্কুলে নেই পর্যাপ্ত সংখ্যক জেন্ডার-বান্ধব শৌচাগার। নেই নির্জনতা, নেই প্রয়োজনীয় পানি বা ডাস্টবিন। ইউনিসেফ-এর গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বহু স্কুলছাত্রী মাসিক চলাকালীন সময় স্কুল মিস করে, এমনকি কেউ কেউ স্কুলই ছেড়ে দেয়। গ্রামীণ এলাকায়, এই সংখ্যা শহরের তুলনায় দ্বিগুণ।

বাস্তব অভিজ্ঞতাঃ
১৩ বছর বয়সে নুসরাত যখন প্রথমবার মাসিকের সম্মুখীন হয়, তখন সে কিছুই জানত না। ক্লাসে বসে হঠাৎ বুঝতে পারে তার জামা ভিজে গেছে। ঘাবড়ে গিয়ে বাড়ি ফিরতেই মা তাকে গম্ভীর মুখে কিছু কাপড় দিয়ে বলেন, "এখন থেকে তোমাকে সাবধানে চলতে হবে। কাউকে বুঝতে দেবে না, বিশেষ করে ছেলেদের।" সেই দিন থেকে নুসরাত অনুভব করে চারপাশের মানুষের পরিবর্তিত আচরণ, যেন তার শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটিই তার অপরাধ।

সামাজিক ব্যাখ্যাঃ
আহমদ ছফা একবার বলেছিলেন, "আমাদের সমাজ মেয়েদের নিজের শরীর চিনতে দেয় না, অথচ পুরুষদের গর্ব শেখায়।” এই সমাজ মেয়েদের বলে-তুমি দূষিত, তুমি অপবিত্র। অথচ এই মেয়েই তো একদিন মা হবে, জাতিকে জন্ম দেবে। তার রক্তকে যদি লজ্জা বলা হয়, তবে লজ্জা তো সমাজেরই।

ভবিষ্যতের পথেঃ
আমাদের প্রজন্মকে বুঝতে হবে, মাসিক কোনো রোগ নয়, এটি পরিচর্যার দাবি রাখে। এই পরিচর্যা মানে শুধু স্যানিটারি ন্যাপকিন নয়-এর মানে স্বাস্থ্যবান্ধব নীতি, স্কুলে শৌচাগার, যৌক্তিক পাঠ্যক্রম এবং সর্বোপরি সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন।

সচেতনতার আহ্বানঃ
মাসিক নিয়ে নীরব থাকলে মেয়েরা কেবল পিছিয়ে পড়ে না, তাদের শরীরও ভেঙে পড়ে। আপনি যদি বাবা হন, আপনার মেয়ের জন্য কথা বলুন। যদি শিক্ষক হন, আপনার শিক্ষার্থীদের জন্য কথা বলুন। এবং যদি আপনি নিজেই একজন কিশোরী হন-আপনার জন্য, আপনার ভবিষ্যতের জন্য, এই সমাজে আপনার রক্তের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করুন।

এই রক্ত পাপ নয়, এই রক্তই জীবন।


কমেন্ট বক্স
প্রতিবেদকের তথ্য
ডেস্ক নিউজ

ডেস্ক নিউজ