কুমিল্লা | বঙ্গাব্দ
৬ বছর পর জামিনে আসামিরা, পুরোনো হ'ত্যার ছায়ায় নতুন করে প্রশ্ন
৬ বছর পর জামিনে আসামিরা, পুরোনো হ'ত্যার ছায়ায় নতুন করে প্রশ্...
0:00
0:00

৬ বছর পর জামিনে আসামিরা, পুরোনো হ'ত্যার ছায়ায় নতুন করে প্রশ্ন

ছবির ক্যাপশন:

কুমিল্লার দেবীদ্বারে ২০২১ সালে পাঁচ বছরের শিশু ফাহিমা আক্তার হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। সেই হত্যাকাণ্ডে শিশুটির বাবা আমির হোসেনসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছিল র‌্যাব। তৎকালীন র‌্যাবের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিবেশী লাইলি আক্তারের সঙ্গে আমির হোসেনের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের বিষয়টি শিশু ফাহিমা জেনে ফেলায় তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। ওই মামলায় লাইলি আক্তারকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

পুরোনো সেই হত্যাকাণ্ডের প্রায় ছয় বছর পর দেবীদ্বারে আবারও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আলোচনায় এসেছে ‘লাইলি’ নামটি। তবে ২০২১ সালের মামলার লাইলি আক্তার এবং বর্তমান হত্যাকাণ্ডে আটক লাইলি আক্তার একই ব্যক্তি কি না—এ বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

যেভাবে আলোচনায় এসেছিল ফাহিমা হত্যাকাণ্ড
২০২১ সালের ৭ নভেম্বর বিকেলে দেবীদ্বারে পাঁচ বছরের শিশু ফাহিমা আক্তার নিখোঁজ হয়। পরে তার বাবা আমির হোসেন থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। মেয়েকে খুঁজতে এলাকায় মাইকিংও করা হয়। ১৪ নভেম্বর দেবীদ্বারের কাচিসাইর গ্রামের একটি ডোবা থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় ফাহিমার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

র‌্যাবের তৎকালীন তদন্তে বলা হয়েছিল, আমির হোসেনের সঙ্গে প্রতিবেশী লাইলি আক্তারের প্রায় এক বছর ধরে সম্পর্ক ছিল। একপর্যায়ে শিশু ফাহিমা তাদের অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখে ফেলে এবং বিষয়টি তার মাকে জানিয়ে দেওয়ার কথা বলে। র‌্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই শিশুটিকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।

র‌্যাব আরও জানিয়েছিল, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ফাহিমাকে চকলেট কিনে দেওয়া ও বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে নির্জন স্থানে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে ছুরিকাঘাত ও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহ বস্তায় ভরে একটি ডোবায় ফেলে দেওয়া হয়।

হত্যাকাণ্ডের পর শিশুটির বাবা নিজেই নিখোঁজের প্রচার চালান এবং থানায় মামলা করেন বলে জানিয়েছিল র‌্যাব। পরে গরুর খাবারের বস্তার সূত্র ধরে তদন্তে অগ্রগতি আসে। একপর্যায়ে আমির হোসেন, লাইলি আক্তারসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

লাইলির ভূমিকা নিয়ে র‌্যাবের বক্তব্য কী ছিল?
তৎকালীন র‌্যাবের সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছিল, লাইলি আক্তার হত্যাকাণ্ডে প্ররোচনা দিয়েছিলেন। র‌্যাবের দাবি ছিল, আমির হোসেন লাইলিকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন এবং তাদের সম্পর্ক প্রকাশ হয়ে গেলে সমস্যা তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই শিশুটিকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।

তবে এসব তথ্য ছিল র‌্যাবের তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দেওয়া বক্তব্য। কোনো ব্যক্তির অপরাধমূলক দায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করার এখতিয়ার আদালতের।

ছয় বছর পর আবারও আলোচনায় ‘লাইলি’
পুরোনো ওই মামলার আসামিরা কয়েক বছর পর জামিনে বেরিয়ে আসেন বলে জানা গেছে। মামলার এক আসামি রেজাউল ইসলাম ইমন পরে প্রবাসে চলে যান বলেও জানা গেছে। অন্যরা দেশে অবস্থান করছিলেন।

এরই মধ্যে শনিবার দেবীদ্বার পৌর এলাকার ছোট আলমপুর গ্রামে ঘটে নতুন নৃশংস হত্যাকাণ্ড। বাড়ির মালিক ফরিদা ইয়াসমিন (৫০) খুন হন। হত্যার পর তাঁর মরদেহ খণ্ডিত করে পলিথিনে প্যাকেট করে বাড়ির পেছনে ফেলে রাখার অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে পলিথিনে মোড়ানো নয়টি প্যাকেট উদ্ধার করেছে। তবে মাথা ও পা এখনো উদ্ধার হয়নি বলে পুলিশ জানিয়েছে।

কীভাবে প্রকাশ পেল নতুন হত্যাকাণ্ড?
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের বরাতে জানা যায়, ফরিদা ইয়াসমিন দীর্ঘদিন ধরে ছোট আলমপুর এলাকায় স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে বসবাস করছিলেন। তাঁর স্বামী মফিজুল ইসলাম জাহাজে চাকরি করেন। দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় ফরিদা বাড়িতে একাই থাকতেন। বাড়ির একটি ঘর ভাড়া দেওয়া হয়েছিল লাইলি আক্তারের কাছে।

শনিবার সকালে ফরিদার মেয়ে মরিয়ম আক্তার বাবার বাড়িতে এসে মাকে দেখতে না পেয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরে সন্ধ্যার দিকে ফরিদার বোনের ছেলে মামুন বাড়ির পেছনে পলিথিনের কয়েকটি প্যাকেট দেখতে পান। সন্দেহ হলে তিনি পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে। ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

এ ঘটনায় স্থানীয় জনতা ভাড়াটিয়া লাইলি আক্তারকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি আরও কয়েকজনের নাম বলেছেন বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে রবিউল, সোহেল, ইমন ও লাইলির স্বামী আবুল কালাম আজাদের নাম রয়েছে। তবে তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি তদন্তে যাচাই করে দেখা হচ্ছে।

দেবীদ্বার থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান জানান, ফরিদা ইয়াসমিনের খণ্ডিত মরদেহের নয়টি প্যাকেট উদ্ধার করা হয়েছে। মাথা ও পা এখনো পাওয়া যায়নি। আটক লাইলিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং অন্যদের আটকের চেষ্টা চলছে।

কেন হত্যা করা হলো ফরিদা ইয়াসমিনকে?
নতুন হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। ভাড়াটিয়া ও বাড়ির মালিকের মধ্যে কোনো বিরোধ, আর্থিক লেনদেন, পূর্বশত্রুতা কিংবা অন্য কোনো কারণ ছিল কি না—তা তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—২০২১ সালের আলোচিত শিশু ফাহিমা হত্যা মামলার লাইলি আক্তার এবং বর্তমান ঘটনায় আটক লাইলি আক্তার কি একই ব্যক্তি? যদি একই ব্যক্তি হন, তাহলে ছয় বছর আগের হত্যাকাণ্ডের পর আবারও একটি হত্যাকাণ্ডে তাঁর নাম আসার পেছনে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

তবে এ মুহূর্তে পুরোনো ফাহিমা হত্যা মামলার সঙ্গে ফরিদা ইয়াসমিন হত্যাকাণ্ডের সরাসরি কোনো সম্পর্ক রয়েছে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই দুটি ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র আছে বলে নিশ্চিতভাবে বলা এখনই সমীচীন নয়।

দেবীদ্বারের নতুন এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে পুলিশি তদন্ত, জিজ্ঞাসাবাদ ও ফরেনসিক পরীক্ষার ফল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তদন্তে প্রকৃত হত্যার কারণ, পরিকল্পনাকারী ও জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা স্পষ্ট হওয়ার পরই পুরো ঘটনার চিত্র পরিষ্কার হবে।

কমেন্ট বক্স
প্রতিবেদকের তথ্য
ডেস্ক নিউজ

ডেস্ক নিউজ