কুমিল্লা | বঙ্গাব্দ

স্মার্টফোনে বন্দি শিশু ও তরুণ প্রজন্ম: বুড়িচংয়ে বাড়ছে ডিজিটাল আসক্তি ও মানসিক চাপ

  • প্রকাশের তারিখ : 8-নভেম্বর-2025 ইং
স্মার্টফোনে বন্দি শিশু ও তরুণ প্রজন্ম: বুড়িচংয়ে বাড়ছে ডিজিটাল আসক্তি ও মানসিক চাপ ছবির ক্যাপশন: স্মার্টফোনে বন্দি শিশু ও তরুণ প্রজন্ম: বুড়িচংয়ে বাড়ছে ডিজিটাল আসক্তি ও মানসিক চাপ

মোঃ আবদুল্লাহ,বুড়িচং।। 
রাত জেগে মোবাইলে গেম খেলা, ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢোকা, আর পড়ার ফাঁকে টিকটক–ইউটিউব স্ক্রল— কুমিল্লার বুড়িচংয়ে বড় একটি অংশের তরুণ–তরুণীর প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে এটি। ডিজিটাল যুগ তথ্যপ্রাপ্তি সহজ করলেও, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ, অস্থিরতা, মনোযোগ ঘাটতি, ক্লান্তি ও হতাশা। স্ক্রিনে অতিরিক্ত ডুবে থাকা তরুণদের ‘ডিজিটাল ডোপামিন’ নির্ভরতায় আসক্ত করে তুলছে, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক আচরণে প্রভাব ফেলছে।

অনিয়ন্ত্রিত স্মার্টফোন ব্যবহারের ফলে পড়াশোনা ও সৃজনশীল চিন্তা ব্যাহত হচ্ছে, ঘুমের গতি নষ্ট হচ্ছে, কমে যাচ্ছে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগ। 

এই বিষয়ে ভারেল্লা দঃ ইউনিয়ন রামপুর  এলাকার বাসিন্দা  মো. মোসলেম  বলেন—আমার ছেলে রাকিব  নবম শ্রেণিতে পড়ে, আগামী বছর এসএসসি পরীক্ষা। কিন্তু বেশির ভাগ সময় সে রুমে দরজা বন্ধ করে মোবাইল নিয়ে বসে থাকে। আমি সারাদিন বাইরে থাকি, তার মা আমাকে প্রায়ই অভিযোগ করে। একদিন আমি নিজেই খেয়াল করলাম—দুই হাত দিয়ে দ্রুত মোবাইল টিপছে, কারও সাথে কথা বলছে। প্রথমে বুঝতে পারিনি, পরে জানতে পারলাম সে ফ্রি ফায়ার নামে একটি গেম খেলছে। এই গেম এখন অসংখ্য তরুণকে নষ্ট করে দিচ্ছে। ছেলেকে নিষেধ করলে রাগ দেখায়, কথা বন্ধ করে দেয়, এমনকি ঠিকমতো খাবারও খায় না। আমি সত্যিই খুব উদ্বিগ্ন, কীভাবে তাকে এ অভ্যাস থেকে সরাবো বুঝতে পারছি না।

আরেক অভিভাবক, বুড়বুড়িয়া এলাকার গৃহবধূ রাবেয়া খাতুন  বলেন—আমার ছেলের বয়স ১১ বছর। শুরুতে বলে পড়ার অ্যাসাইনমেন্ট দেখবে, তাই আমি মোবাইল দিই। কিন্তু কিছুক্ষণ পর মোবাইল ফেরত চাইলে সে রাগ করে, হাত থেকে ফোন ছাড়তে চায় না, এমনকি মানসিকভাবে খুব অস্থির হয়ে পড়ে। আগে এমন ছিল না। এখন মনে হয় মোবাইলটা যেন ওর থেকে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এই পরিবর্তন আমাকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছে তিনি বলেন-এভাবে চলতে থাকলে ওর পড়াশোনা, আচার–আচরণ আর ভবিষ্যৎ কী হবে ভাবতে পারি না।

এ বিষয়ে রামচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক  রিপন   বলেন—ডিজিটাল আসক্তি এবং মানসিক চাপ সত্যিই উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে। এখন অনেক ছাত্র–ছাত্রী ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। রাত জেগে মোবাইল ব্যবহারের কারণে সকালে তারা ক্লান্ত থাকে, ফলে পড়ালেখায় আগ্রহ কমে যাচ্ছে এবং শেখার সক্ষমতাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শিক্ষকদের জন্যও এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, মোবাইল দূরে রাখলে শিশুরা অস্থির হয়ে পড়ে, যা তাদের আচরণগত পরিবর্তনের দিকেও ইঙ্গিত দেয়।

এ বিষয়ে  ডা. ফরহাদ  বলেন—ডিজিটাল আসক্তি আজকের তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ সময় মোবাইল, কম্পিউটার বা ট্যাবলেটের স্ক্রিনে থাকলে উদ্বেগ, হতাশা, একঘেয়ে ভাব ও ঘুমের ব্যাঘাত বাড়ছে। তিনি আরও  জানান, এ ধরনের আচরণ মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও সৃজনশীল চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করছে। 

এ বিষয়ে ভরাসার বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কামরুল হাসান  বলেন—বর্তমান সময়ে শিশু ও কিশোরদের মধ্যে ডিজিটাল আসক্তি উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে তাদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যে গুরুতর প্রভাব পড়ছে। অনেক শিশুর মধ্যে খাওয়াদাওয়ার অনিহা দেখা দিচ্ছে, ফলস্বরূপ পুষ্টিহীনতার ঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি চোখের সমস্যা, কানে ব্যথা বা শ্রবণ সমস্যার মতো শারীরিক জটিলতাও বাড়ছে। সবচেয়ে চিন্তার বিষয়, বাচ্চারা মাঠে খেলতে যাচ্ছে না, সমবয়সীদের সঙ্গে মেলামেশা এড়িয়ে চলছে, এমনকি আত্মীয়–স্বজন বাড়িতে এলে সামনেও আসতে চাচ্ছে না।দীর্ঘ সময় মোবাইল বা ট্যাবলেট ব্যবহারের কারণে তাদের ঘুমের স্বাভাবিকতা ভেঙে যাচ্ছে, মনোযোগ কমছে এবং সামাজিক দক্ষতা দুর্বল হয়ে পড়ছে।

তিনি বলেন-পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে প্রযুক্তি ব্যবহারে সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে, শিশুদের পর্যাপ্ত ঘুম, খোলা জায়গায় খেলাধুলা এবং মানুষের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি করতে হবে। তা না হলে তারা ভার্চুয়াল দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে বড় হবে, যা ভবিষ্যতে মানসিক ও সামাজিক বিকাশে বড় বাধা তৈরি করবে।

কমেন্ট বক্স
প্রতিবেদকের তথ্য
ডেস্ক নিউজ

ডেস্ক নিউজ