কুমিল্লার দেবিদ্বারে সরকারি সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
নিয়োগপ্রক্রিয়ায় বিএনপির ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীদের বঞ্চিত করা, ডিও লেটার বা সুপারিশপত্রের অপব্যবহার এবং অর্থের বিনিময়ে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন দলটির স্থানীয় নেতারা। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
গত ৭ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে দেবিদ্বার উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার জন্য সার ডিলার নিয়োগের তালিকা অনুমোদন দেওয়া হয়। তালিকাটি প্রকাশ্যে আসার পরই স্থানীয় রাজনৈতিক মহল ও সচেতন মহলে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়।
১৬টি ডিও লেটারে দলীয় ব্যক্তি মাত্র তিনজন?
অভিযোগকারী নেতাদের দাবি, দেবিদ্বার উপজেলা ও পৌরসভা এলাকায় বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে সংগ্রহ করা ১৬টি ডিও লেটার বা সুপারিশপত্রের বিপরীতে মাত্র তিনজন দলীয় নেতাকর্মী সার ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। বাকি সুপারিশপত্রগুলো কার মাধ্যমে এবং কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রাশেদা বেগম হীরা সার ডিলার নিয়োগের এই ফলাফলে গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ১৬টি ডিও লেটারের বিপরীতে মাত্র তিনজন দলীয় ব্যক্তি ডিলার মনোনীত হওয়ায় তিনি হতাশ। এ বিষয়ে উপজেলা বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের কাছে তিনি আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চাইবেন বলেও জানা গেছে। রাশেদা বেগম হীরার ভাষ্যমতে, উপজেলা বিএনপির দায়িত্বপ্রাপ্ত দু-একজন নেতা ছাড়া তিনি অন্য কাউকে ডিও লেটার দেননি। অথচ এর পরেও প্রকৃত ত্যাগী নেতাকর্মীরা বঞ্চিত হওয়ায় নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
বিতর্কিতদের তালিকাভুক্তি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ
সুলতানপুর, মোহনপুর, গুনাইঘর দক্ষিণ ও ফতেহাবাদ ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগের প্রাথমিক তালিকায় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং বিতর্কিত ব্যক্তিদের নাম রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ফতেহাবাদ ইউনিয়ন: ভাই ভাই ট্রেডার্সের মালিক মো. আবদুর রব এবং গুনাইঘর দক্ষিণ ইউনিয়নের শেখ ট্রেডার্সের মালিক আবুল হাসেমের বিরুদ্ধে অতীতে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নির্বাচনি কার্যক্রমে অর্থ ও জনবল দিয়ে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে।
সুলতানপুর ইউনিয়ন: হাবিব স্টোরের মালিক হাবিবুর রহমানের নামও তালিকায় রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, তিনি কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য।
মোহনপুর ইউনিয়ন: সাগর ট্রেডার্সের মালিক প্রশাদ চন্দ্র সিংহের শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। দীর্ঘদিন ধরে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত ও ক্রাচের ওপর নির্ভরশীল এই ব্যক্তির নামে প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড থাকার পরেও ডিলার নিয়োগে তাঁর ব্যবসায়িক সক্ষমতা কতটুকু যাচাই করা হয়েছে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে।
স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের অভিযোগ, অর্থের বিনিময়ে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে সুপারিশপত্র বিক্রি বা অপব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এসব আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত ও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি সার ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব, সুপারিশপত্রের অপব্যবহার এবং দুর্নীতির সমস্ত অভিযোগ খতিয়ে দেখতে আইনানুগভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন বিএনপির বিভিন্ন ইউনিয়নের নেতারা। একই সঙ্গে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী, কৃষিমন্ত্রী, কৃষি বিভাগ এবং দলের বিভাগীয় সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা সেলিম ভূঁইয়া ও মোস্তাক মিয়ার নজরে আনা হয়েছে।
নেতাকর্মীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্তপূর্বক অনিয়ম প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের ডিলারশিপ বাতিল করতে হবে এবং প্রকৃত যোগ্যদের তালিকাভুক্ত করতে হবে। অন্যথায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা কৃষি কার্যালয় ঘেরাওয়ের মতো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
প্রশাসনের বক্তব্য এ বিষয়ে উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্যসচিব ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বানিন রায় জানান, উপকমিটির মাধ্যমে সব আবেদনকারীর তথ্য যাচাই-বাছাই করে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে এবং তিন দিনের মধ্যে আপত্তি পাওয়া নামগুলো যাচাই করে রেজুলেশন পাঠানো হয়েছে।
এছাড়া কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অশোক বিক্রম চাকমা জানান, জেলা কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত ফরম্যাটে সরেজমিনে অনুসন্ধান করেই প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছিল
মো মাসুদ রানা