প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ। বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মুগ্ধতার কথা বলে বোঝানো যাবে না। কোথাও সবুজের সমারোহ, কোথাও পাহাড়ের সারি, কোথাও বা স্বচ্ছ পানির ধারা প্রবহমান। তাই বুঝি কবি জীবনানন্দ দাশ বাংলার প্রকৃতিতে মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন—
“বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর—”
সেই সৌন্দর্যের মুগ্ধতার টানে এবার পা বাড়িয়েছিলাম সিলেটের পথে। সিলেট আমার জন্মস্থান হওয়ায় বরাবরই সিলেটের প্রতি একটা বিশেষ অনুভূতি কাজ করে।
আমরা সিলেটের উদ্দেশ্যে বের হই ৩০ মে রাত ৯টার দিকে। সঙ্গে ছিল আমার মা, বাবা এবং ছোট ভাই। আমরা রেলযোগে সিলেটে যাই। ভোরের মোরগ ডাকার সময়ই পৌঁছে যাই পুণ্যভূমি সিলেটে। হোটেলে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর সকালের খাবার শেষ করে বেলা ১১টার দিকে আমরা বের হই চা-বাগানের উদ্দেশ্যে।
চা-বাগানের আঁকাবাঁকা পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে চারপাশের সবুজে মিশে যেতে ইচ্ছে হচ্ছিল। সবুজের সারি সারি পাহাড় সবাইকে মুগ্ধ করেছিল। চা-বাগানের অপরূপ দৃশ্য অবলোকনের পর সেখান থেকে দুপুরেই চলে যাই জাফলংয়ের উদ্দেশ্যে। জাফলংয়ে যাওয়ার পর মনে পড়ছিল রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি ও বিশ্বজগতের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কবিষয়ক একটি বিখ্যাত গানের পঙ্ক্তি—
“আকাশভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ,
তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান।”
দূরের পাহাড়, পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া স্বচ্ছ জলধারা আর নদীর বিস্তীর্ণতা—সবকিছু মিলিয়ে পুরো জায়গাটি যেন সৃষ্টিকর্তার তৈরি প্রকৃতির এক নিখুঁত ক্যানভাস।
জাফলং থেকে আসার সময় স্মৃতি হিসেবে আমি কিছু পাথর সংগ্রহ করে নিয়ে আসি। রাত ৯টায় আমরা হোটেলে ফিরে আসি এবং সারাদিনের ক্লান্তিতে রাতের খাবার শেষ করেই ঘুমিয়ে পড়ি।
পরদিন সকালে খাবার শেষ করে বের হই বাংলাদেশের একমাত্র মিঠা পানির জলাবন বা সোয়াম্প ফরেস্ট রাতারগুলের উদ্দেশ্যে। যা ‘বাংলার অ্যামাজন’ বা ‘সিলেটের সুন্দরবন’ নামেও পরিচিত। নৌকায় করে বনের ভেতর প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে পানির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা গাছ, সবুজ পাতার আড়াল, নীরবতা আর ধীরগতিতে এগিয়ে চলা নৌকা—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল যেন গল্পগাথার কোনো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পথ দিয়ে যাচ্ছি।
শহরের কোলাহল থেকে দূরের এই নীরবতার মাঝে যেন হারিয়ে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে বের হয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে চলে গেলাম বাংলার কাশ্মীরখ্যাত ভোলাগঞ্জের সেই সাদা পাথর দেখার উদ্দেশ্যে। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের উঁচু উঁচু সবুজ পাহাড় এবং অন্যদিকে পাহাড় থেকে নেমে আসা স্বচ্ছ পানির নদী—সব মিলিয়ে অপূর্ব এক দৃশ্য। সাদা পাথরের ওপর বয়ে যাওয়া স্বচ্ছ পানির ধারার মুগ্ধতা ভ্রমণের আরেকটি স্মরণীয় জায়গা হিসেবে পরিচিত হয়ে আছে আমার কাছে। পাহাড় থেকে নেমে আসা পানির ধারা পাথরের ওপর দিয়ে ছুটে চলেছিল।
আমি সেখানে শুধু কিছুক্ষণ বসে পানির কলকল শব্দ শুনছিলাম। স্বচক্ষে পাহাড় ও ঝরনা একসঙ্গে মিশে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য তৈরি করার দৃশ্য অবলোকনের পর মনে পড়ে যায় নজরুলগীতির রূপকল্পের মধ্য দিয়ে পাহাড়ের সৌন্দর্য তুলে ধরা গানের প্রথম পঙ্ক্তি—
“আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই
ওই পাহাড়ের ঝর্না আমি, ঘরে নাহি রই গো উধাও হ'য়ে”
ঠিক পাহাড় যেন আকাশে হেলান দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। পাহাড়ের বুক থেকে ঝরনা নেমে আসছে, চারদিকে বন্য ও অপরূপ প্রকৃতির পরিবেশ। যার মুগ্ধতা দেখে আমরা সকলেই মুগ্ধ।
কিছু জায়গা থেকে মানুষ ফিরে আসে ঠিকই, কিন্তু সেই জায়গার স্মৃতি তার মনের মানসপট থেকে কখনো মুছে যায় না—সিলেট আমার কাছে তেমনি একটি জায়গা।
লেখক: নিশাত নাবিলা
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
নিশাত নাবিলা