কুমিল্লা | বঙ্গাব্দ
একটি জীবন,যে জীবনের আলো ছড়িয়ে আছে ১৪০০ বছর ধরে
একটি জীবন,যে জীবনের আলো ছড়িয়ে আছে ১৪০০ বছর ধরে
0:00
0:00

একটি জীবন,যে জীবনের আলো ছড়িয়ে আছে ১৪০০ বছর ধরে

ছবির ক্যাপশন:

সেই মানুষটির গল্প বলি। হয়তো তাঁর গল্প আগেও শুনেছেন। প্রায় ১৪০০ বছর ধরে যাঁকে মুসলিম জাতি নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। যাঁর আগমনে আরবের অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজে নতুন আলো জ্বলে উঠেছিল। যাঁর জীবন ও আদর্শ আজও কোটি কোটি মানুষের পথচলার অনুপ্রেরণা। তিনি হজরত মুহাম্মদ (সা.)।

শামায়েলে তিরমিজির বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি ছিলেন মধ্যম আকৃতির ও সুঠাম দেহের অধিকারী। তাঁর চুল ছিল ঘাড় পর্যন্ত প্রলম্বিত এবং হালকা কোঁকড়ানো। তাতে তেল দিয়ে আঁচড়ালে যেন মৃদু ঢেউয়ের মতো সৌন্দর্য ফুটে উঠত। তাঁর কপাল ছিল প্রশস্ত, ভ্রু ছিল ধনুকের মতো বাঁকা। তাঁর চোখের পাতা ছিল দীর্ঘ ও আকর্ষণীয়। তাঁর শারীরিক সৌন্দর্য বর্ণনা করা হলেও তাঁর প্রকৃত মহত্ত্ব নিহিত ছিল তাঁর চরিত্র, জীবনাদর্শ ও মানবিকতায়। তাঁর সীরাত আজও মানুষের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে বিবেচিত।

তাঁর জীবন ও প্রভাব নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন ইতিহাসবিদ ও গবেষক আলোচনা করেছেন।তারমধ্যে  মার্কিন লেখক ও জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী মাইকেল এইচ. হার্ট তাঁর ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত The 100 গ্রন্থে বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকায় হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে প্রথম স্থানে রেখেছেন। হার্ট তাঁর ধর্মীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্র ও সমাজ বিনির্মাণে তাঁর ভূমিকার বিষয়টিও বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন।

হার্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মুহাম্মদ (সা.) শুধু একটি ধর্মীয় বার্তা প্রচার করেননি; ইসলাম প্রতিষ্ঠা ও বিস্তারের ক্ষেত্রে তিনি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর প্রভাব ব্যক্তিগত ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর নেতৃত্বে একটি নতুন ধর্মীয় সম্প্রদায় ও সামাজিক কাঠামোর বিকাশ ঘটে। প্রায় ১৪ শতাব্দী পরও তাঁর অনুসারীরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর শিক্ষা ও আদর্শ অনুসরণ করে চলেছেন।

রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। মক্কায় ধর্মপ্রচারের মাধ্যমে তাঁর যাত্রা শুরু হলেও মদিনায় তিনি একটি সংগঠিত সমাজের নেতৃত্ব দেন। আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন গোত্র ও গোষ্ঠীকে একটি বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত।

হার্টের বিশ্লেষণে আরও উঠে আসে, মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রভাব শুধু ধর্মীয় ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর নেতৃত্বে ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক নিয়ম, রাজনৈতিক সংগঠন ও আইন—এসব পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি নতুন সমাজব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করে। এ কারণেই হার্ট তাঁকে ইতিহাসের অন্যান্য ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের তুলনায় স্বতন্ত্র প্রভাবসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে বিশ্লেষণ করেছেন।

হার্টের দৃষ্টিতে মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রভাব ছিল দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যাপক। তাঁর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় ও সামাজিক ব্যবস্থা পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন, মূল্যবোধ ও সামাজিক কাঠামোকে প্রভাবিত করেছে।

তাঁর চরিত্র ও জীবনাদর্শ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনেও সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। সূরা আল-আহযাবের ২১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে

“নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ—তার জন্য, যে আল্লাহ ও পরকাল প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।”

তাঁর জীবন ছিল অত্যন্ত সাদাসিধে ও অনাড়ম্বর। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে জানা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘরে থাকাকালে পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতেন। নামাজের সময় হলে নামাজের জন্য চলে যেতেন। অর্থাৎ পারিবারিক কাজে সহযোগিতা করাকে তিনি নিজের মর্যাদার পরিপন্থী মনে করতেন না।

শিশুদের প্রতিও তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশীল। একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, তিনি তাঁর নাতি হাসান বা হুসাইনকে চুম্বন করছিলেন। তখন এক ব্যক্তি বিস্ময় প্রকাশ করলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে জানান, যে ব্যক্তি দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।

শুধু গুরুগম্ভীর জীবন নয়, তাঁর জীবনে ছিল হাস্যরসও। হাদিসে এসেছে, তিনি সাহাবিদের সঙ্গে হাসতেন ও রসিকতা করতেন। তবে তাঁর রসিকতাতেও সত্যের সীমা অতিক্রম করত না। একবার এক বৃদ্ধ সাহাবি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বৃদ্ধরা জান্নাতে প্রবেশ করবে কি না। তিনি রসিকতা করে বলেছিলেন, বৃদ্ধরা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এতে ওই ব্যক্তি কিছুটা বিচলিত হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) ব্যাখ্যা করেন যে, জান্নাতে সবাই তরুণ অবস্থায় প্রবেশ করবে। এভাবেই তাঁর জীবনে হাস্যরসের মধ্যেও ছিল সৌজন্য, সত্যনিষ্ঠা ও মানুষের অনুভূতির প্রতি সম্মান।

মাত্র ৬৩ বছরের জীবন। কিন্তু সেই জীবনের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে বহু শতাব্দী পেরিয়ে আজও। ব্যক্তি জীবন থেকে পারিবারিক জীবন, সামাজিক আচরণ থেকে নেতৃত্ব, অর্থনৈতিক আচরণ থেকে ন্যায়বোধ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর জীবন মুসলিমদের কাছে অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে বিবেচিত।

একটি জীবন কীভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কোটি কোটি মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করতে পারে—হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন তারই এক অনন্য উদাহরণ। তাঁর জন্মের প্রায় ১৪ শতাব্দী পরও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কোটি কোটি মানুষ তাঁর প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আনুগত্য ধারণ করে জীবন পরিচালনা করছে।

৬৩ বছরের সেই জীবন তাই সময়ের সীমানায় আবদ্ধ কোনো ইতিহাস নয়; ১৪ শতাব্দী পেরিয়েও তা কোটি কোটি মানুষের কাছে ভালোবাসা, বিশ্বাস ও আদর্শের এক জীবন্ত আলোকবর্তিকা।

কমেন্ট বক্স
প্রতিবেদকের তথ্য
ডেস্ক নিউজ

ডেস্ক নিউজ