কুমিল্লা | বঙ্গাব্দ

কুমিল্লায় জমিতে অম্লতা বৃদ্ধি, উৎপাদন কমার শঙ্কা

  • প্রকাশের তারিখ : 7-ডিসেম্বর-2025 ইং
ছবির ক্যাপশন:

কুমিল্লা, চাঁদপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃষিজমিতে দ্রুত বাড়ছে অম্লতা বা অ্যাসিডের মাত্রা। বিশেষ করে কুমিল্লায় পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। জেলার প্রায় অর্ধেক কৃষিজমিতে মাটির অম্লতা এখন বিপৎসীমার ওপরে। চারটি উপজেলায় অ্যাসিডের মাত্রা শতভাগ জমিতেই বেড়ে গেছে। এতে কৃষকরা বাড়তি খরচ করেও পাচ্ছেন না আশানুরূপ ফলন। কৃষি বিভাগের অভিযোগ, জৈব সার কম ব্যবহার করায় এবং একই জমিতে বারবার রাসায়নিক সার প্রয়োগ করায় এ সমস্যা তীব্র হচ্ছে।

কুমিল্লা কৃষি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, 'সদর, লাকসাম, বরুড়া ও লালমাই উপজেলার প্রায় সব জমিতেই অ্যাসিডের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়েছে। পুরো জেলার প্রায় ৫০ শতাংশ জমি এখন আক্রান্ত।' তিনি জানান, জৈব সার বাদ দিয়ে পরপর একাধিক মৌসুমে রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলেই জমির এই অবস্থা।

মাটি ও সার গবেষকরা জানান, আবাদি জমিতে পিএইচ ৫ দশমিক ৫-এর নিচে নেমে এলে ফসল উৎপাদন ঝুঁকির মুখে পড়ে। তিনি আরও জানান, জমিতে অ্যাসিড বেড়ে গেলে মাটিতে সার দেওয়া হলেও গাছ প্রয়োজনীয় পুষ্টি শোষণ করতে পারে না। কুমিল্লায় গত মৌসুমে ১ লাখ ৯৪ হাজার ১২২ হেক্টর জমিতে ৪ লাখ ৮৩ হাজার ৮৯৫ মে. টন আমন ধান এবং ৫৬ হাজার ২৪৭ মে. টন সবজি উৎপাদন হয়। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মাটির গুণাগুণ ঠিক না থাকলে এবার এই উৎপাদন কমে যেতে পারে।

কুমিল্লা মৃত্তিকা গবেষণা কেন্দ্রের সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার ডা. আবু মো. শাহাদাত হোসেন জানান, 'কুমিল্লা-চাঁদপুর-ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের ৯৩ শতাংশ মাটিতে জৈব পদার্থের ঘাটতি রয়েছে।' তিনি আরও জানান, 'এই অঞ্চলজুড়ে ৪৭শতাংশ জমিতে অ্যাসিডের মাত্রা বেড়েছে। ৯৭শতাংশ জমিতে নাইট্রোজেন, ৮৬ শতাংশে ফসফরাস, ৮৯ শতাংশে পটাসিয়াম এবং ৬৬ শতাংশ জমিতে সালফারের ঘাটতি রয়েছে।"তিনি বলেন, 'তিন জেলার ১৮ হাজার ৮০৫ হেক্টর জমিতে খুবই শক্তিশালী অম্লতা পাওয়া গেছে। আরও ২ লাখ ৭৬ হাজার ২৮৬ হেক্টর জমিতে পিএইচ মাত্রা ৪.৫-এ নেমে গেছে। এসব জমিতে আশানুরূপ ফলন পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।'
মাঠপর্যায়ের কৃষকরাও ক্ষতির চাপে পড়েছেন। কুমিল্লা সদর উপজেলার গোমতী চরের কৃষক সুজন বলেন, 'অগ্রিম শীতকালীন ফসল হিসেবে মাঠে রেখেই প্রায় সাড়ে ৬ লাখ টাকার মুলা বিক্রি করেছিলাম। কিন্তু তুলতে গিয়ে দেখি মুলা কালো হয়ে গেছে ও ফেটে গেছে। পরে ক্রেতাকে টাকা ফেরত দিতে হয়েছে। এক মাঠেই আমার সাড়ে ৬ লাখ টাকার ক্ষতি। কৃষি অফিসাররা বলেন মাটিতে অ্যাসিড বেড়ে গেছে।' একই এলাকার কৃষক আমিনুল ইসলাম বলেন, 'আমরা বুঝি না। এত সার দিই, এত পরিচর্যা করি- তবুও ফলন পাই না। বছরে একাধিক ফলন তুলতে হয়। হঠাৎ ফলন কমে গেলে বড় ক্ষতির মুখে পড়ি।'

লালমাই উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা লায়লা আরজুমান বলেন, 'আমরা কৃষকদের মাটি পরীক্ষার পরামর্শ দিচ্ছি। নিজেরাও মাটি সংগ্রহ করে মৃত্তিকা গবেষণা কেন্দ্রে পাঠাচ্ছি। পরীক্ষার ফল অনুযায়ী সারের সঠিক মাত্রা জানিয়ে দিচ্ছি।'সদর দক্ষিণ উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ জুনায়েদ কবির খান বলেন, 'দীর্ঘদিন একটানা রাসায়নিক সার ব্যবহারের কারণেই অম্লতা বাড়ে। জমিতে অ্যাসিড থাকলে যত সারই দেওয়া হোক, মাটি সেই পুষ্টি ধরে রাখতে পারে না। তাই চাষের আগে আমরা কৃষকদের ডলোচুন ব্যবহারের পরামর্শ দিই।'

উপপরিচালক মিজানুর রহমান জানান, 'তিন বছরে একবার ডলোচুন ব্যবহার করতে হবে। সবচেয়ে সস্তা গোড়া চুন শতকে চার কেজি দিলেই মাটির গুণাগুণ বাড়ে। সালফার জাতীয় সারের আধিক্য থাকলেও অতি সালফার আয়ন ও ম্যাগনেসিয়াম আয়নের কারণে অম্লতা কমে আসে।' তিনি আরও বলেন, 'জৈব সার মাটির প্রাণ। জৈব সার বা উপকারী অনুজীব না থাকলে মাটি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারে না। পাশাপাশি টপ সয়েল রক্ষা করাও জরুরি। কৃষক বাঁচলে কৃষি বাঁচবে; না হলে উৎপাদন কমে জাতীয় ক্ষতির মুখে পড়ব।

কমেন্ট বক্স
প্রতিবেদকের তথ্য
ডেস্ক নিউজ

ডেস্ক নিউজ