দেবিদ্বারে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সশস্ত্র হামলার শিকার হয়ে এক বছর ধরে বাকশক্তিহীন জীবন কাটাচ্ছে জুলাই যোদ্ধা আবু বকর। গত বছরের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে ভয়াবহ হামলার শিকার হয় ১৬ বছরের এই মাদ্রসা শিক্ষার্থী। এক সময়ের প্রাণচঞ্চল ছেলেটি আজ নিজ বাড়িতে বাকহীন, নিথর-নিশ্চুপ আর অসহায় জীবন কাটাচ্ছে।
ঘটনার পর কেটে গেছে এক বছর, কিন্তু আজও ফিরেনি তার স্বাভাবিক জীবন। হারিয়ে ফেলেছে কথা বলার ক্ষমতা। কোন কিছু জিজ্ঞাসা করলে কেবল নিঃশব্দে তাকিয়ে থেকে মিটি মিটি হাসে। চিকিৎসকদের ভাষ্য, মস্তিষ্কে আঘাতের কারণে তার বাকশক্তি ফেরার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। আর পরিবারের দাবী—আর্থিক সংকট আর সরকারি অবহেলায় থমকে আছে চিকিৎসার পথ।
আবু বকরের মা বলেন, “ওর মুখের দিকে তাকানো যায় না। চুপচাপ বসে থাকে, কোনো প্রশ্নের জবাব দেয় না, শুধু তাকিয়ে থাকে ফ্যালফ্যাল করে। খাওয়া, গোসল, টয়লেট—সব কিছুতে আমাদের সহায়তা লাগে।”
আবু বকর বর্তমানে কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার শাকতলা গ্রামের নিজ বাড়িতে চিকিৎসাধীন। এক সময়ের হাসিখুশি ছেলেটি এখন নিঃশব্দ জীবনের বন্দী। চোখে-কানে স্পর্শে প্রতিক্রিয়া নেই বললেই চলে। তার বড় ভাই আলী মিয়া বলেন, “বৃদ্ধ মা-বাবাসহ পাঁচজনের সংসারে আমিই একমাত্র উপার্জনকারী। সামান্য বেতনে গাড়ি চালাই। আমি নিজেও লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত। আমার চিকিৎসায় বাবার সব সঞ্চয় শেষ হয়ে গেছে। এরপর আবু বকরের চিকিৎসার জন্য ধারদেনা করতে হয়েছে। গুরুতর আঘাত প্রাপ্ত হবার পরও সরকারিভাবে ‘সি’ ক্যাটাগরির আহত দেখানো হয়েছে তাকে, ফলে কোনো উল্লেখযোগ্য অনুদান পাচ্ছি না।”
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ছোট আলমপুর থেকে দেবিদ্বার কলেজ রোড হয়ে নিউমার্কেট স্বাধীনতা চত্বরের দিকে যাচ্ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিশাল একটি মিছিল। তাদের প্রতিহত করতে ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীরা মিছিলে সশস্ত্র হামলা চালায়। আহত হন আবু বকরসহ কয়েকজন। মিছিলের অগ্রভাগে থাকা আবু বকরকে বেশ কয়েকজন এক সাথে ঘিরে ধরে এলোপাথারি কুপিয়ে ও পিটিয়ে মৃত ভেবে কালাচান সুপার মার্কেটের অদূরে ফেলে রেখে যায়। মাথায় মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত আবু বকরকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়। আঘাত গুরুতর হওয়ায় সেখান থেকে তাকে ইস্টার্ণ মেডিকেল কলেজ, পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ এবং সর্বশেষ ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তার মাথার খুলি খুলে রেখে একাধিকবার অপারেশন করা হয়। অবস্থা ক্রিটিক্যাল হওয়ায় দুইবার আইসিইউতে রাখা হয় তাকে। দীর্ঘদিন চিকিৎসা শেষে অবস্থার কিছু উন্নতি হওয়ায় চিকিৎসকরা বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। সম্প্রতি সে তার গ্রামের বাড়িতেই অবসস্থান করছে।
তার বাবা আবুল খায়ের বলেন, “শান্তিপূর্ণ মিছিলে ছিল আমার ছেলে। তবুও ওকে কুপিয়ে, পিটিয়ে পঙ্গু করে দিয়েছে। এখন ও কিছুই বুঝতে পারে না, নিজের হাতে খেতেও পারে না। আমরা কোথায় যাব, কার কাছে বলব?”
ঘটনার পর আবুল খায়ের বাদী হয়ে দেবিদ্বার থানায় মামলা করেন। মামলায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের প্রায় ৭০–৭৫ জন নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করা হয়। মামলাটি এখনো বিচারাধীন। ইতোমধ্যে কয়েকজন গ্রেপ্তার হলেও বেশিরভাগ আসামি পলাতক রয়েছে।
আন্দোলনের সময় আবু বকরের সঙ্গে থাকা এক সহপাঠী বলেন, “আবু বকর ছিল আমাদের সাহসের প্রতীক। আজ সে নিঃস্ব। এ ঘটনার বিচার হওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো শিক্ষার্থীর এমন পরিণতি না হয়।”
আবু বকরের পরিবার বলছে, তারা ইতোমধ্যে চিকিৎসার নথিপত্রসহ সঠিক ক্যাটাগরি সংশোধনের জন্য জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনে আবেদন করেছেন। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও অনুদানের বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা মেলেনি।
এ বিষয়ে দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ আবুল হাসনাত খাঁন বলেন, “আবু বকরের পরিবারের আবেদনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। অনুদানের প্রক্রিয়া দ্রুততর করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।”
কুমিল্লা গেজেট