কুমিল্লা | বঙ্গাব্দ
সুতো-কাঁচামালের চড়া দাম, অস্তিত্ব সংকটে গ্রামীণ তাঁতশিল্প
সুতো-কাঁচামালের চড়া দাম, অস্তিত্ব সংকটে গ্রামীণ তাঁতশিল্প
0:00
0:00

সুতো-কাঁচামালের চড়া দাম, অস্তিত্ব সংকটে গ্রামীণ তাঁতশিল্প

ছবির ক্যাপশন:

বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর গ্রামীণ সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান স্মারক হস্তচালিত তাঁতশিল্প আজ চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়ে বিলুপ্তির পথে ধাবিত হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির আগ্রাসী বিকাশ, বাজারে সুতা ও রঙের চড়া দাম এবং পাওয়ার লুম বা বৈদ্যুতিক মেশিনের তীব্র দাপটের কারণে প্রান্তিক কারিগরেরা বাজারে টিকতে পারছেন না ।গ্রামীণ জনপদের হাজার হাজার তাঁতীর ঘর আজ নীরব; মাকু আর তন্তুর সেই চিরচেনা ‘খটখট’ শব্দ এখন ইতিহাস হয়ে যাচ্ছে।

সম্প্রতি মফস্বলের একটি গ্রামীণ তাঁতশালায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় এক জরাজীর্ণ ও নিস্তব্ধ চিত্র । বাঁশ ও কাঠের তৈরি ঐতিহ্যবাহী হস্তচালিত ‘খটখটি তাঁতযন্ত্রটি’ ধুলোবালি মেখে অলস পড়ে আছে। পেছনে টানানো জরাজীর্ণ কাগজে স্পষ্ট লেখা রয়েছে ঐতিহ্যবাহী ‘জামদানি শিল্পী’দের নাম । এটি প্রমাণ করে, এই সাধারণ কাঠামোর মধ্য দিয়েই একসময় গ্রামীণ সুনিপুণ কারিগরদের আঙুলের ছোঁয়ায় বোনা হতো বিশ্বখ্যাত জামদানি শাড়ি, যা আজ চরম অবহেলা ও পুঁজিসংকটে বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
তদন্ত ও স্থানীয় কারিগরদের সাথে কথা বলে ঐতিহ্যবাহী এই লোকশিল্পের বর্তমান দুর্দশা ও সংকটের ৪টি মূল কারণ উঠে এসেছে:

কাঁচামালের আকাশচুম্বী মূল্য ও কারিগরদের মানবেতর জীবন:
তাঁতশিল্পের প্রধান কাঁচামাল হলো সুতা এবং বিভিন্ন রাসায়নিক রঙ। গত কয়েক বছরে বাজারে সুতা ও রঙের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় কাপড় তৈরির উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে। কিন্তু সেই তুলনায় উৎপাদিত কাপড়ের পাইকারি বা খুচরা মূল্য বাড়েনি। ফলে দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে দিনশেষে তাঁতশিল্পীরা তাদের ন্যায্য মজুরি পাচ্ছেন না। সংসার চালাতে না পেরে অনেকেই এই পৈতৃক পেশা ছেড়ে রিকশা চালানো, দিনমজুরি কিংবা অন্য কোনো কঠিন পেশায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

আধুনিক যন্ত্রের দাপট ও অসম প্রতিযোগিতা:
পাওয়ার লুম বা বৈদ্যুতিক মেশিনে খুব অল্প সময়ে, কম খরচে এবং বিপুল পরিমাণে শাড়ি, লুঙ্গি বা চাদর তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। হস্তচালিত তাঁতে একটি ভালো মানের শাড়ি বুনতে যেখানে কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগে, সেখানে আধুনিক যান্ত্রিক মিলে দিনে কয়েক ডজন শাড়ি তৈরি হয়। ফলে হস্তচালিত তাঁতের সুনিপুণ কারুকার্যময় সুতি ও জামদানি কাপড়গুলো বাজারের সস্তা ও যান্ত্রিক কাপড়ের সাথে অসম প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না।

 মধ্যস্বত্বভোগী ও দালালদের দৌরাত্ম্য:
গ্রামীণ প্রান্তিক তাঁতীদের বড় একটি समस्या হলো সঠিক বাজারজাতকরণ। তারা সরাসরি বড় বাজারে গিয়ে ভালো মূল্যে কাপড় বিক্রি করার সুযোগ পান না। স্থানীয় চাটুকার, মহাজন এবং মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটগুলো তাঁতীদের অভাবের সুযোগ নিয়ে নামমাত্র মূল্যে কাপড় আগাম কিনে নেয় এবং পরে শহুরে বাজারে তা চড়া দামে বিক্রি করে বিপুল মুনাফা লোটে। ফলে মূল কারিগরেরা বরাবরই সুবিধাবঞ্চিত ও অর্থনৈতিকভাবে শোষিত থেকে যান।

নতুন প্রজন্মের অনীহা ও পুঁজির অভাব:
পেশাটিতে পর্যাপ্ত আয় এবং সামাজিক স্বীকৃতি না থাকায় তাঁতীদের নতুন প্রজন্ম এই প্রাচীন শিল্পে আর আসতে চাইছে না। তাছাড়া হস্তচালিত তাঁতকে টিকিয়ে রাখতে বা আধুনিকায়ন করতে যে ধরণের সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ বা সরকারি প্রণোদনা প্রয়োজন, তা সাধারণ গ্রামীণ তাঁতীদের নাগালের বাইরে। কোনো ধরণের অর্থনৈতিক ব্যাকআপ বা পুঁজি না থাকায় ঐতিহ্যবাহী এই ঘরোয়া কারখানাগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

উত্তরণের উপায় ও আমাদের করণীয়:
বাঙালির এই প্রাচীন ঐতিহ্য ও জিআই (GI) পণ্য রক্ষার স্বার্থে এখনই প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি

কাঁচামালে ভর্তুকি: সরকার বা তাঁত বোর্ডের উদ্যোগে তাঁতীদের জন্য কম মূল্যে সুতা এবং উন্নত মানের রঙ সরবরাহের বিশেষ ব্যবস্থা করতে হবে।

সহজ শর্তে ঋণ: জামদানি ও ঐতিহ্যবাহী কারিগরদের জন্য বিনা সুদে বা নামমাত্র সুদে দীর্ঘমেয়াদী ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার।

সরাসরি বাজারজাতকরণ: মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে সরকারি উদ্যোগে সরাসরি তাঁতীদের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্যে কাপড় কিনে বড় বড় মেলা বা রাষ্ট্রীয় আউটলেটে বিক্রির ব্যবস্থা করা উচিত।

তাঁতশিল্প কেবল একটি পেশা নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয় ও গৌরবের প্রতীক। এই হস্তচালিত তাঁতযন্ত্রগুলো যদি চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়, তবে এ দেশের লোকশিল্পের এক বিশাল গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় চিরতরে সমাহিত হবে। সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই এই ঐতিহ্যবাহী জামদানি ও তাঁতশিল্পীদের বাঁচাতে প্রশাসন এবং সমাজকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে

কমেন্ট বক্স
প্রতিবেদকের তথ্য
ডেস্ক নিউজ

ডেস্ক নিউজ