কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) অতীতের ডিন নিয়োগে নিয়মের ব্যত্যয় 'সমন্বয়' করার যুক্তিতে আবারও পাঁচ অনুষদে ডিন নিয়োগ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
তবে এ নিয়োগেও বিশ্ববিদ্যালয় আইনে নির্ধারিত বিভাগভিত্তিক রোটেশন ও জ্যেষ্ঠতার নীতি অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। পদবঞ্চিত শিক্ষকদের দাবি, একাধিক অনুষদে আইনের বিধান উপেক্ষা করে ডিন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ অভিযোগে রেজিস্ট্রার বরাবর লিখিত আবেদন জানিয়েছেন গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, আইন উপদেষ্টার মতামত ও ডিন নিয়োগসংক্রান্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
'সমন্বয়' যুক্তিতে তৃতীয় দফায় ডিন নিয়োগ
গত সোমবার তৃতীয়বারের মত বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোহাম্মদ নূরুল করিম চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে পাঁচ অনুষদে তৃতীয় দফায় ডিন নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৯তম ও ১১০তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত, ডিন নিয়োগসংক্রান্ত গঠিত কমিটির প্রতিবেদন এবং আইন উপদেষ্টার পরামর্শের ভিত্তিতে উপাচার্য পাঁচ শিক্ষককে ডিন হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন।
নিয়োগপ্রাপ্তরা হলেন, বিজ্ঞান অনুষদে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সজল চন্দ্র মজুমদার, কলা ও মানবিক অনুষদে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ শামসুজ্জামান মিলকী, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ রেজাউল করিম, প্রকৌশল অনুষদে সিএসই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাহমুদুল হাছান এবং ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এমদাদুল হক।
সর্বশেষ এই নিয়োগের আগে একই পদে আরও দুই দফা অন্তর্বর্তীকালীন নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। গত ১১ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৯তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্তের আলোকে আইন বিশেষজ্ঞের মতামত না আসা পর্যন্ত ছয় অনুষদে অন্তর্বর্তীকালীন ডিন নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে আইন অনুষদে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাসুদা কামাল, কলা ও মানবিক অনুষদে অধ্যাপক ড. এম. এম. শরীফুল করিম, বিজ্ঞান অনুষদে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে অধ্যাপক ড. মো. শামীমুল ইসলাম, প্রকৌশল অনুষদে অধ্যাপক ড. মো. তোফায়েল আহমেদ এবং ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদে অধ্যাপক ড. শেখ মকছেদুর রহমানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তবে ওই সময় ইংরেজি বিভাগের প্রধান ও বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম. এম. শরীফুল করিম ডিন নিয়োগকে বিশ্ববিদ্যালয় আইনবহির্ভূত দাবি করে দায়িত্ব গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে তাঁর পরিবর্তে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. জি. এম. মনিরুজ্জামানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম. এম. শরীফুল করীম দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৮ মে আগের নিয়োগাদেশ বাতিল করে সাময়িকভাবে নিজেই সব অনুষদের ডিনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরে প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখতে ২০ মে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পাঁচ অনুষদে নতুন করে অন্তর্বর্তীকালীন ডিন নিয়োগ দেওয়া হয়। সর্বশেষ ৬ জুলাই সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত, কমিটির প্রতিবেদন এবং আইন উপদেষ্টার মতামতের ভিত্তিতে তৃতীয় দফায় ডিন নিয়োগ দেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় আইন কী বলছে
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০৬-এর ধারা ২২-এর উপধারা (৫) অনুযায়ী, উপাচার্য সিন্ডিকেটের অনুমোদনক্রমে প্রত্যেক অনুষদের বিভিন্ন বিভাগের অধ্যাপকদের মধ্য থেকে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পালাক্রমে দুই বছরের জন্য ডিন নিয়োগ দেবেন।
একই ব্যক্তি পরপর দুই মেয়াদে ডিন হতে পারবেন না। কোনো বিভাগে অধ্যাপক না থাকলে ওই বিভাগের জ্যেষ্ঠতম সহযোগী অধ্যাপক ডিন হিসেবে নিয়োগ পাবেন। কোনো বিভাগের একজন অধ্যাপক ডিনের দায়িত্ব পালন করলে পরবর্তী পালাগুলোতে ওই বিভাগের অবশিষ্ট অধ্যাপকরা জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে ডিন হওয়ার সুযোগ পাবেন। আর একাধিক বিভাগে সমজ্যেষ্ঠ অধ্যাপক বা সহযোগী অধ্যাপক থাকলে তাঁদের মধ্যে ডিন পদের আবর্তনক্রম নির্ধারণ করবেন উপাচার্য।
তবে অভিযোগ উঠেছে, সর্বশেষ ডিন নিয়োগে এই রোটেশন ও জ্যেষ্ঠতার নীতি একাধিক ক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয়নি। রোটেশন ভেঙে গণিত, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা এবং অ্যাকাউন্টিং বিভাগ বঞ্চিতের অভিযোগ।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অতীতের নিয়মের ব্যত্যয় 'সমন্বয়' করার যুক্তিতে সর্বশেষ ডিন নিয়োগ দিলেও, এতে বিশ্ববিদ্যালয় আইনে নির্ধারিত বিভাগভিত্তিক রোটেশন অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অন্তত তিনটি অনুষদে রোটেশন ও জ্যেষ্ঠতার নীতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বিজ্ঞান অনুষদের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বিভাগ গণিত। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ বিভাগটি মাত্র একবার পূর্ণ মেয়াদে ডিন পেয়েছে। অথচ চার বছর পরে প্রতিষ্ঠিত পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ এ পর্যন্ত তিনবার ডিন পেয়েছে। বিভাগভিত্তিক রোটেশন অনুযায়ী এবার গণিত বিভাগ থেকেই ডিন নিয়োগ হওয়ার কথা থাকলেও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ডিন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, "গণিত বিভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বিভাগ হওয়া সত্ত্বেও এ পর্যন্ত মাত্র একবার পূর্ণ মেয়াদে ডিন পেয়েছে। কিন্তু এই বিভাগের অনেক বছর পরে প্রতিষ্ঠিত হওয়া বিভাগে দুই-তিনবার ডিন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী রোটেশন হলে এবার গণিত বিভাগ থেকেই ডিন নিয়োগ দেওয়ার কথা। আর গণিত বিভাগ থেকে আমিই সেটার প্রাপ্য।"
একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদেও। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিভাগভিত্তিক আবর্তন অনুযায়ী এবার গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে ডিন নিয়োগ পাওয়ার কথা থাকলেও লোক প্রশাসন বিভাগ থেকে ডিন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. বেলাল হোসাইন।
এদিকে ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদেও রোটেশন অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় আইনের রোটেশন অনুযায়ী এবার অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ থেকে ডিন নিয়োগ দেওয়ার কথা থাকলেও ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ থেকে ডিন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ২০২২ সালে হওয়া নিয়মের ব্যত্যয়ের সমন্বয় করা হয়েছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
লোক প্রশাসন বিভাগেও জ্যেষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন
রোটেশনের পাশাপাশি সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে জ্যেষ্ঠতার নীতি অনুসরণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। লোক প্রশাসন বিভাগ থেকে ডিন নিয়োগ দেওয়া হলেও বিভাগের জ্যেষ্ঠতম অধ্যাপককে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধান অনুযায়ী অধ্যাপক ড. মো. রশিদুল ইসলাম শেখ ডিন হওয়ার কথা ছিলেন। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের গনঅভুত্থানে মামলার জটিলতা থাকায় তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু তাহের বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয়ে এরকম অনেক নজির আছে যে সহযোগী অধ্যাপক থাকাবস্থায় ডিন হয়েছেন, পরে অধ্যাপক হওয়ার পরে আবার ডিন হয়েছেন।"
২০২২ সালের ব্যত্যয় সমন্বয়ের কথা বললেও উত্তর নেই ২০১৮ সালের অনিয়ম নিয়ে ডিন নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, আইন উপদেষ্টার মতামত এবং ডিন নিয়োগসংক্রান্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই সর্বশেষ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের ভাষ্য, নিকট অতীতে হওয়া নিয়মের ব্যত্যয় সমন্বয় করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোহাম্মদ নূরুল করিম বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন উপদেষ্টা ও ডিন নিয়োগের জন্য গঠিত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ছিলেন ফার্মেসি বিভাগ থেকে, কিন্তু তখন পাওয়ার কথা ছিল পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের। ২০২২ সালে সাবেক উপাচার্য মঈন স্যার তখন নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়েছিলেন। তাই এটা রিকভার করার জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।"
তবে এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন অভিযোগকারী শিক্ষকরা। গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেনের দাবি, যদি অতীতের নিয়মের ব্যত্যয় সমন্বয় করাই উদ্দেশ্য হয়, তাহলে সর্বপ্রথম যেখানে ব্যত্যয় ঘটেছে, সেখান থেকেই তা শুরু হওয়া উচিত ছিল।
তিনি বলেন, "নিয়মের ব্যত্যয় ঘটার কারণে যদি এরকম সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে প্রথমে যেখানে ব্যত্যয় ঘটেছে সেটা আগে রিকভার করা দরকার ছিল। ২০১৮ সালে গণিত বিভাগ থেকে ডিন নিয়োগ দেওয়ার কথা থাকলেও তখন কেমিস্ট্রি বিভাগ থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে নিয়মের ব্যত্যয় প্রথমে ঘটেছে গণিত বিভাগের সঙ্গে। তাই সমঝোতা করতে হলে গণিত বিভাগের সঙ্গে করাটাই বিধিবদ্ধ হবে।"
ডিন নিয়োগে বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকদের বাদ দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রেজিস্ট্রার বলেন, "আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। আপনি ভিসি স্যারের সঙ্গে কথা বলেন।"
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, "আমি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের ধারা ২২-এর উপধারা (৫) শুধু বিশ্লেষণ করেছি। আমি নিয়োগের ব্যাপারে জানি না। তবে নিকট অতীতে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে বিধায় সেখানে সমঝোতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।"
তার কাছে ২০২২ সালের আগেও যদি একই ধরনের নিয়মের ব্যত্যয় ঘটে থাকে, তাহলে শুধু ২০২২ সালের ঘটনাকেই কেন বিবেচনায় নেওয়া হলো জানতে চাইলে। জবাবে তিনি বলেন, "আমাকে এত কিছু জানানো হয়নি। আমাকে শুধু ২০২২ সালের নিকট অতীতের নিয়মের ব্যত্যয় সম্পর্কে জানানো হয়েছে। আমি শুধু সেটুকুরই বিশ্লেষণ করেছি। আপনি এক পত্রিকায় কাজ করে তো অন্য পত্রিকায় লিখতে পারবেন না। ২০১৮ সালে যদি কারও সঙ্গে এমন হয়ে থাকে, সেটা দেখবে তখনকার প্রশাসন। ২০২২ সালে হলে দেখবে ২০২২ সালের প্রশাসন, আর বর্তমান সময়ে হলে দেখবে বর্তমান প্রশাসন। যদি এরকম ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে সেই প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করা উচিত।"
এদিকে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাসুদা কামাল বলেন, "২০২২ সালে হওয়া নিয়মের ব্যত্যয় ঠিক আইন বিশেষজ্ঞের মতামতের ভিত্তিতে সমঝোতামূলক ডিন নিয়োগ হয়েছে।"
তবে ২০২২ সালের আগের অভিযোগগুলো কেন এই প্রক্রিয়ায় বিবেচনায় নেওয়া হয়নি, জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে জানতে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করীমকে কল দেওয়া হলে তিনি ফোনে কথা বলতে রাজি না হয়ে তার দপ্তরে যাওয়ার কথা বলেন। পরে তার দপ্তরে একাধিক বার গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে পুনরায় তাকে ফোন করা হলে তিনি ফোন ধরেননি৷
কুবি প্রতিনিধি