কুমিল্লায় একের পর এক আলোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জননিরাপত্তা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সর্বশেষ স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজনিম হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক ঘটনার পর জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ মানুষ। এর মধ্যেই জেলা প্রশাসনের মাসিক আইনশৃঙ্খলা কমিটির কার্যপত্রে গত সেপ্টেম্বর মাসে জেলায় ১৬টি খুনের ঘটনায় মামলা দায়েরের উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।
রোববার (১১ অক্টোবর) কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মাসিক আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভার কার্যপত্রের বিবরণী থেকে এ তথ্য জানা যায়। সভায় জেলার বর্তমান অপরাধ পরিস্থিতি এবং জননিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে কুমিল্লার বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে আতঙ্ক তৈরি করেছে। এর মধ্যে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজনিমকে ধর্ষণের পর হত্যার মর্মান্তিক ঘটনাটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবিকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
এ বিষয়ে কুমিল্লা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আনিসুজ্জামান সংবাদ সম্মেলনে জানান, চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের মোটিভ ও রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে। নিহতের মোবাইল ফোনের কললিস্ট ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় মূল অভিযুক্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমনকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ সুপারের ভাষ্যমতে, গভীর রাতে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে অটোরিকশায় তুলে ওই কিশোরীকে নির্জন স্থানে নিয়ে পৈশাচিক নির্যাতন ও হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় জড়িত অন্য কেউ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশের তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
মহাসড়কে নিরাপত্তা জোরদার ও সিএনজির ডাটাবেজ উদ্যোগ মহাসড়কে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সিএনজিচালিত অটোরিকশার অপব্যবহার করে সংঘটিত অপরাধ প্রতিরোধে একটি বড় উদ্যোগ হাতে নিয়েছে জেলা প্রশাসন। এখন থেকে চালক ও মালিকদের সুনির্দিষ্ট তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাফর সাদিক চৌধুরী বলেন, "মহাসড়কে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা বেশ কিছু বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছি। দ্রুত সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও চালকদের একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার বা ডাটাবেজের আওতায় আনা হবে। এছাড়া প্রতিটি সিএনজিতে মালিক ও চালকের তথ্যসংবলিত পরিচিতি কার্ড ঝুলিয়ে রাখতে হবে." মহাসড়কে নিরাপত্তা জোরদার করতেই সভায় এসব সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
একের পর এক হত্যাকাণ্ড, ছিনতাই ও ডাকাতির মতো অপরাধের কারণে কুমিল্লা একটি আতঙ্কিত জনপদ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে কুমিল্লার বিভিন্ন থানায় ৩৭টি হত্যা মামলা হয়েছে। এর মধ্যে জুলাইয়ে ১০, আগস্টে ১১ এবং সেপ্টেম্বর মাসে ১৬টি মামলা হয়েছে। এছাড়া জেলায় তিন মাসে বিভিন্ন অপরাধে ১,০৭৪টি মামলা হয়েছে এবং গত ৯ মাসে কুমিল্লায় ১০৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কেবল তথ্যভান্ডার তৈরিই যথেষ্ট নয়; বরং অপরাধের ঘটনাগুলোর দ্রুত তদন্ত, জড়িতদের সঠিক সময়ে শনাক্তকরণ এবং কঠোর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সমানভাবে জরুরি। গণপরিবহনে নজরদারি বাড়ালে অপরাধ তদন্ত অনেক সহজ হয়।
তবে সাধারণ মানুষের দাবি, কেবল কাগজে-কলমে বা সভা-সেমিনারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এসব উদ্যোগের কঠোর বাস্তবায়ন, নিয়মিত তদারকি এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। জেলাবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরও সমন্বিত ও জোরালো ভূমিকার ওপর জোর দিচ্ছেন সচেতন মহল।
মো: মাসুদ রানা